সঞ্জয় লীলা বনসালীর পদ্মাবতী সিনেমা মুক্তি নিয়ে চলছে বিতর্ক। এই সিনেমায় চিতরের রানী পদ্মাবতীর চরিত্রকে বিকৃত করে দেখানো হয়েছে এই অভিযোগ চলছে করণী সেনার হামলা এবং আন্দোলন। আগে ছবির সেটে এই ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালীর উপর হামলা চালিয়েছিল করনী সেনা।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যাবে এই রানী পদ্মিনীর গল্প যা রূপকথাকেও হার মানায়। এই ছবিটি মুক্তি পাওয়ার ঠিক আগে রাজপুত করণী সেনা সিনেমাটি যাতে মুক্তি না পায় তার দাবীতে আন্দোলন করছে। ছবির পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনসালী এবং অভিনেত্রী দীপিকা পাদুকোনকে বিভিন্ন রকম হুমকীও দিচ্ছে। সিনেমায় রাজপুত রানী পদ্মাবতীর সম্পর্কে কি এমন দেখানো হয়েছে যে রাজপুতরা সিনেমাই বন্ধ করে দিতে চাইছে? তাহলে জেনে নেওয়া যাক রানী পদ্মিনী অর্থাৎ পদ্মাবতীর আসল ইতিহাস।
রানী পদ্মিনী ছিলেন সিংহলের রাজা গন্ধর্ব সেনের সুন্দরী কন্য পদ্মাবতী। সেইসময় মেবারের রাজধানী ছিল চিতোর বা চিতোরগড়। এই চিতোরের রাজা ছিলেন মহারানা রতন সিং। অন্যদিকে রাজকন্যা পদ্মিনীর রূপে গোটা দেশ ছিল মুগ্ধ। পদ্মিনীর বাবা গন্ধর্ব সেন এক বিরাট সয়ম্বর সভার আয়োজন করেন।
সবাইকে টেক্কা দিয়ে রানী পদ্মিনীর বিয়ে হয় চিতোরের রাজা রাওয়াল রতন সিং এর সাথে। মহারাজা রতন সিং এর স্ত্রী ছিলেন এই রানী পদ্মিনী। এই রানী পদ্মিনীকে ডাকা হত পদ্মাবতী নামেও। রানী পদ্মিনী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। তাঁর সৌন্দর্যের খ্যাতি সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজপুতদের স্থানীয় লোকগাথা থেকে জানা যায় যে রানী পদ্মিনীরে রূপের কথা পৌঁছে যায় দিল্লীর দরবারে। তখন দিল্লীর দরবারে শাসন করছেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি।
আলাউদ্দিন খিলজি ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে চিতোর আক্রমন করেন। শোনা যায় রানী পদ্মিনীর রূপের দর্শন এবং বন্দী করতেই নাকি আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমন করেন। প্রচন্ড পরাক্রমী আলাউদ্দিন খিলজির আক্রমন প্রতিহত করতে পারেনি রাজপুতরা।
রতন সিংকে কারারুদ্ধ করেন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। এরপর আলাউদ্দিন খিলজি রানীর কাছে প্রস্তাব পাঠান যদি পদ্মিনী খিলজির সাথে দিল্লী যেতে রাজি হয় তাহলে রাণা রতন সিং কে ছেড়ে দেওয়া হবে।
এই গুরুগম্ভীর সময়ে রাজপুতরা কিছুটা চালাকি করে রাণা রতন সিং কে মুক্ত করেন। রাজপুতরা রানী এবং তাঁর পরিচারিকাদের পালকিতে করে রানীর বদলে কিছু সৈন্য পাঠিয়ে রাণা রতন সিং কে মুক্ত করে আনেন।
এই ঘটনায় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি খুবই খেপে যান। সুলতান খিলজি চিতোর ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। তাঁর বিপুল সৈন্য নিয়ে দুর্গ ঘেরাও করেন। রাজপুতরা বীর হলেও খিলজির বিপুল সৈন্য বাহিনীর কাছে পেরে ওঠেনি। রাণা রতন সং রাজপুত সেনাদের নির্দেশ দেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। ভয়ঙ্কর এই লড়াইয়ে বীর রাজপুত সেনাদের পরাজয় ঘটে। যুদ্ধে মারা যান মহারাণা রতন সিং।
সুলতান খিলজি এবং তাঁর সেনাবাহিনী দুর্গের দরজা ভেঙে দুর্গের মধ্যে ঢুকে পড়েন রানী পদ্মিনীকে দখল করার জন্য। রানী পদ্মিনী বুঝতে পারেন আর কোনো উপায় নেই। তাঁর সামনে দুটি পথ খোলা আছে। একটি হল মৃত্যু এবং আর একটি হল সুলতান খিলজির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তাঁর সাথে দিল্লী যাওয়া।
কিন্তু রাজপুত পুরুষদের মতোই রাজপুত মহিলারাও ছিলেন বীরাঙ্গনা। তখনকার দিনে অনেক রাজপুত নারীই নিজের সম্মান রক্ষার জন্য আত্মাহুতি দিতেন। রানী পদ্মিনী নিজের সম্মান রক্ষার জন্য জহর ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
শুধুমাত্র রানী পদ্মিনী নন, এইভাবে নিজের সম্মান রক্ষার জন্য তখনকার দিনে অনেক রাজপুত মহিলাই এইভাবে আত্মহত্যা করতেন। রাজপুতরা যে কত বীর ছিলেন তা তাদের ইতিহাস ঘাঁটলেই জানা যায়। তাঁরা যেমন বীরের মতো বাঁচতেন, তেমনি তাদের সম্মান রক্ষার জন্য বীরের মতো প্রানও বিসর্জন দিতেন।
কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদের মতে বাস্তবে এই রানী পদ্মিনীর কোনো অস্তিত্বই নেই। তবে সুফি কবি মালি মোহম্মদ জয়সীর লেখা ‘পদ্মাবত’ কাব্যে এই রানী পদ্মিনীর চরিত্রের উল্লেখ রয়েছে। এই কাব্যগাথাটি লেখা হয়েছিল ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে। তবে অনেকের মনে করেন যে এই কাব্যগাথাটি ছিল রূপক। সুতরাং এই রানী পদ্মিনীর চরিত্রটিও রূপক।
ইতিহাস যাই বলুক না কেন রানী পদ্মিনী হলেন একজন মহীয়সী রাজপুত নারীর প্রতিনিধি। তাঁর চরিত্রের মাধমেই জানা যায় তখনকার রাজপুত নারীরা কেমন সাহসী ছিলেন। তাঁর চরিত্রের মধ্য দিয়ে তখনকার সমগ্র রাজপুত নারী চরিত্রের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে।
উপরের ছবিতে যে বাড়িটি দেখতে পাচ্ছেন, সেই বাড়িটি হল রানী পদ্মিনী প্যালেস। এখনও রাজস্থানের চিতোরগড়ে রানির এই প্যালেসটি এই অবস্থাতেই আছে। এখানেই একটা ছোটো লেকের মধ্যে ছিল রানী পদ্মিনীর প্যালেস। গরমকালে এখানে খুব ঠান্ডা হাওয়া বইত। তাই এখানে সেইসময় রানী থাকতেন। কথিত আছে আলাউদ্দিন খিলজি রানীকে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাজপুতরা রানী পদ্মিনীকে সরাসরি সুলতান খিলজির মুখোমুখি আনতে চাননি। তাই এই বাড়িতে একটি বড় আয়না লাগিয়েছিলেন যাতে আলাউদ্দিন খিলজি পদ্মিনীকে সেই আয়নার মাধ্যমে দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে পারেন।
এই আয়নাটিকে এমন একটি নির্দিষ্ট কোণ করে লাগানো হয়েছিল যাতে সেই আয়নায় ফুটে ওঠা প্রতিবিম্ব আলাউদ্দিন খিলজি প্যালেসের বাইরে থেকে দেখতে পান।আজও এই প্যালেসে সেই বিখ্যাত আয়নাটি রাখা আছে। কোনো গাইড নিয়ে এই প্যালেসে ভ্রমণ করতে গেলে তার মুখে শুনতে পাবেন এই আয়নার ইতিহাস!
আমাদের এই প্রতিবেদন ভালো লাগলে শেয়ার করুন আপনার ফেসবুকের বন্ধুদের সাথে। কি ধরনের পোস্ট পেতে চান তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। আপনার কোনো রকম পরামর্শ থাকলে তাও কমেন্ট করে জানাতে পারেন। আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সাহায্য করবে আরো ভালো ভালো প্রতিবেদন তৈরি করতে।





